মার্কিন শুল্কনীতি

এপ্রিলের পর সবচেয়ে খারাপ সপ্তাহ পার করল এশিয়ার শেয়ারবাজার

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সৃষ্ট শুল্ক বিবাদে বিরতির পূর্বনির্ধারিত সময়সীমা শেষ হয়েছিল গতকাল।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সৃষ্ট শুল্ক বিবাদে বিরতির পূর্বনির্ধারিত সময়সীমা শেষ হয়েছিল গতকাল। এদিন পর্যন্ত সব মিলিয়ে ৬৮টি দেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) ওপর নতুন শুল্ক ধার্য হয়। সময়সীমা শেষ হওয়ার মুহূর্তে কানাডা, বাংলাদেশসহ কিছু দেশের জন্য শুল্ক ঘোষিত হয়। এর তাৎক্ষণিক প্রভাবে গতকাল নিম্নমুখী হয়ে ওঠে এশিয়ার শেয়ারবাজারের অধিকাংশ সূচক। এ পতনের মধ্য দিয়ে এপ্রিলের পর সবচেয়ে খারাপ সপ্তাহ পার করল এশিয়ার শেয়ারবাজার। খবর এপি ও রয়টার্স।

অবশ্য সময়সীমা নিয়ে অনিশ্চয়তা বজায় রেখেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এর আগে ১ আগস্ট থেকে শুল্ক বিরতি শেষ হওয়ার ঘোষণা দিলেও এখন তা এক সপ্তাহ পিছিয়ে দিয়েছেন। এটিও বাজারে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।

এমএসসিআইয়ের (জাপান ছাড়া) এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের শেয়ার সূচক গতকাল কমেছে ১ দশমিক ১ শতাংশ। ফলে সপ্তাহজুড়ে মোট ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ২ শতাংশ, যা এপ্রিলের পর সর্বোচ্চ।

গতকাল জাপানের নিক্কেই ২২৫ সূচক দশমিক ৭ ও দক্ষিণ কোরিয়ার কসপি সূচকে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ পতন দেখা যায়। প্রাথমিক পতন কিছুটা সামাল দিলেও হংকংয়ের হ্যাং সেং সূচক দশমিক ৮ শতাংশ কমেছে। সাংহাই কম্পোজিট সূচক কমেছে দশমিক ৫ শতাংশ।

অস্ট্রেলিয়ার এসঅ্যান্ডপি এএসএক্স ২০০ সূচক কমেছে দশমিক ৯ শতাংশ। ভারতের বিএসই সেনসেক্স সূচক দশমিক ১ শতাংশ বাড়লেও তাইওয়ানের তাইএক্স সূচক দশমিক ৫ শতাংশ পড়ে যায়।

ওয়াল স্ট্রিটে বৃহস্পতিবার বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর শেয়ারদরে ঊর্ধ্বগতি দেখা গেলেও তা বজায় থাকেনি। এরপর স্বাস্থ্যসেবা খাতের শেয়ারের পতনে দিনশেষে আরো ক্ষতির মুখে পড়ে বাজার।

এদিকে এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক গতকাল দশমিক ৪ শতাংশ কমে যায়, যা টানা তৃতীয় দিনের মতো পতন। এসঅ্যান্ডপি ৫০০-এর প্রায় ৭০ শতাংশ কোম্পানির শেয়ারদর কমেছে। এর মধ্যে স্বাস্থ্যসেবা কোম্পানিগুলো বাজারে সবচেয়ে বড় নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। ডাও জোন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাভারেজ দশমিক ৭ ও নাসডাক কম্পোজিট সূচক দশমিক ১ শতাংশ কমেছে।

পুঁজিবাজারের প্রতিক্রিয়া বিষয়ে র‍্যাবো ব্যাংকের সিনিয়র মার্কেট স্ট্র্যাটেজিস্ট বেনজামিন পিকটন বলেন, ‘মার্কিন ও ইউরোপীয় ইকুইটি ফিউচার নেতিবাচক দিকে ইঙ্গিত করছে, এশিয়ার স্টকগুলো মার খাচ্ছে, আর ডলারের সূচক এখনো বাড়ছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র তার নিজের অর্থনীতির জন্য উচ্চমূল্য সংযোজন খাতগুলো বেছে নিচ্ছে এবং বাণিজ্য অংশীদারদের ওপর চাপ দিচ্ছে, যেন তারা মার্কিন রফতানির জন্য বাজার খুলে দেয় এবং সস্তায় পণ্য সরবরাহ করে। ভুল করবেন না এটা সাম্রাজ্যবাদী বাণিজ্য।’

অন্যদিকে মিজুহো ব্যাংক বলছে, আসিয়ান দেশগুলো বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় যারা ‘লিবারেশন ডের’ পর বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, এখন শুল্কের ব্যবধানের কারণে তুলনামূলকভাবে কিছুটা ভালো অবস্থানে রয়েছে, তবে অঞ্চলটির দেশগুলোর মধ্যে শুল্ক পার্থক্য খুব বেশি নয়।

প্রতিবেদন অনুসারে, হোয়াইট হাউজ বড় ওষুধ কোম্পানিগুলোকে ৬০ দিনের মধ্যে মূল্যহ্রাস ও অন্যান্য পরিবর্তনের জন্য অনুরোধ জানিয়ে চিঠি দিয়েছে। সে চিঠি প্রকাশের পর স্বাস্থ্যসেবা খাতের শেয়ারদরে পতন দেখা দেয়।

তবে মার্কিন বাজারের সামগ্রিক পতনকে কিছুটা ঠেকিয়ে রেখেছে কিছু বড় প্রযুক্তি কোম্পানির শক্তিশালী পারফরম্যান্স। ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের মূল প্রতিষ্ঠান মেটা প্লাটফর্মের বিক্রি ও মুনাফা পূর্বাভাস ছাড়িয়ে যাওয়ায় শেয়ারের দাম ১১ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়েছে। অন্যদিকে প্রত্যাশার তুলনায় ভালো আর্থিক প্রতিবেদনের পর মাইক্রোসফটের শেয়ারদর বেড়েছে ৩ দশমিক ৯ শতাংশ। বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্দীপনার কারণে বাজারের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে।

মুদ্রাবাজার দেখা যাচ্ছে, ডলারের বিপরীতে ইয়েন দুর্বল হয়েছে। আগের দিন ১ ডলারের বিনিময় হার ১৫০ দশমিক ৬৭ থেকে ১৫০ দশমিক ৪৭ ইয়েনে নেমেছে। অন্যদিকে ইউরোর বিনিময় হার ১ দশমিক ১৪২১ থেকে বেড়ে ১ দশমিক ১৪৩১ ডলার হয়েছে।

গত বৃহস্পতিবার রাতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেন। যার অধীনে দেশটিতে আমদানীকৃত পণ্যের ওপর ১০-৪১ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক প্রযোজ্য হবে। এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ভারত, বাংলাদেশ, তাইওয়ান, থাইল্যান্ড ও দক্ষিণ কোরিয়ার ওপর যথাক্রমে ২৫, ২০, ২০, ১৯ ও ১৫ শতাংশ হারে শুল্ক নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া কানাডার পণ্যের ওপর শুল্ক ২৫ থেকে বাড়িয়ে ৩৫ শতাংশ করা হয়েছে। অবশ্য বৃহৎ বাণিজ্য অংশীদারদের মধ্যে মেক্সিকো ৯০ দিনের জন্য শর্তসাপেক্ষ ছাড় পেয়েছে।

ভিপি ব্যাংকের এশিয়া অঞ্চলের চিফ ইনভেস্টমেন্ট অফিসার থমাস রুপফের মতে, সর্বশেষ শুল্ক ঘোষণায় কিছুটা অস্পষ্টতা রয়েছে। কিছু দেশ অপেক্ষাকৃত ভালো শর্ত পেলেও এর সামগ্রিক প্রভাব নেতিবাচক। যার প্রভাবে প্রবৃদ্ধি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

পুঁজিবাজারে খারাপ পারফরম্যান্সের পরও গতকাল মার্কিন বন্ড বাজার তুলনামূলকভাবে স্থির ছিল। দুই বছর মেয়াদি মার্কিন ট্রেজারি ইল্ড ৩ দশমিক ৯৫ শতাংশে অপরিবর্তিত ছিল। ১০ বছর মেয়াদি বন্ডের ইল্ড ২ বেসিস পয়েন্ট বেড়ে দাঁড়ায় ৪ দশমিক ৩৭ শতাংশ, যদিও পরে ২ বেসিস পয়েন্ট কমে যায়।

আরও